আগে বিষয় নির্বাচন করুন!
মানুষ তার মনের ভাব অন্যের কাছে প্রকাশ করার জন্য কণ্ঠধ্বনি এবং হাত, পা, চোখ ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাহায্যে ইঙ্গিত করে থাকে। কণ্ঠধ্বনির সাহায্যে মানুষ যত বেশি পরিমাণ মনোভাব প্রকাশ করতে পারে, ইঙ্গিতের সাহায্যে ততটা পারে না। আর কণ্ঠধ্বনির সহায়তায় মানুষ মনের সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাবও প্রকাশ করতে সমর্থ হয়। কণ্ঠধ্বনি বলতে মুখগহ্বর, কণ্ঠ, নাক ইত্যাদির সাহায্যে উচ্চারিত বোধগম্য ধ্বনি বা ধ্বনি সমষ্টিকে বোঝায়। এই ধ্বনিই ভাষার মূল উপাদান। এই ধ্বনির সাহায্যে ভাষার সৃষ্টি হয়। আবার ধ্বনির সৃষ্টি হয় বাগ্যন্ত্রের দ্বারা। গলনালি, মুখবিবর, কণ্ঠ, জিহ্বা, তালু, দাঁত, নাক ইত্যাদি বাক্ প্রত্যঙ্গকে এক কথায় বলে বাগ্যন্ত্র। এই বাগযন্ত্রের দ্বারা উচ্চারিত অর্থবোধক ধ্বনির সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমকে ভাষা বলে।
সকল মানুষের ভাষাই বাগযন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট। তবুও একই ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টির অর্থ বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হতে পারে। এ কারণে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর জন্য আলাদা আলাদা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের কণ্ঠনিঃসৃত বাক্ সংকেতের সংগঠনকে ভাষা বলা হয়। অর্থাৎ বাগযন্ত্রের দ্বারা সৃষ্ট অর্থবোধক ধ্বনির সংকেতের সাহায্যে মানুষের ভাব প্রকাশের মাধ্যমই হলো ভাষা ।
দেশ, কাল ও পরিবেশভেদে ভাষার পার্থক্য ও পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থান করে মানুষ আপন মনোভাব প্রকাশের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বস্তু ও ভাবের জন্য বিভিন্ন ধ্বনির সাহায্যে শব্দের সৃষ্টি করেছে। সেসব শব্দ মূলত নির্দিষ্ট পরিবেশে মানুষের বস্তু ও ভাবের প্রতীক (Symbol) মাত্র। এ জন্যই আমরা বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষার ব্যবহার দেখতে পাই। সে ভাষাও আবার বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়ে এসেছে। ফলে, এ শতকে মানুষ তার দৈনন্দিন জীবনে যে ভাষা ব্যবহার করে, হাজার বছর আগেকার মানুষের ভাষা ঠিক এমনটি ছিল না।
বর্তমানে পৃথিবীতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। তার মধ্যে বাংলা একটি ভাষা। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলা পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ মাতৃভাষা। বাংলাদেশের অধিবাসীদের মাতৃভাষা বাংলা। বাংলাদেশের ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের জনসাধারণ এবং ত্রিপুরা, বিহার, উড়িষ্যা ও আসামের কয়েকটি অঞ্চলের মানুষের ভাষা বাংলা। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ বিশ্বের অনেক দেশে বাংলা ভাষাভাষী জনগণ রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ত্রিশ কোটি লোকের মুখের ভাষা বাংলা
বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলের জনগণ নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষায় কথা বলে। এগুলো আঞ্চলিক কথ্য ভাষা বা উপভাষা। পৃথিবীর সব ভাষায়ই উপভাষা আছে। এক অঞ্চলের জনগণের মুখের ভাষার সঙ্গে অপর অঞ্চলের জনগণের মুখের ভাষার যথেষ্ট পার্থক্য দেখা যায়। ফলে এমন হয় যে, এক অঞ্চলের ভাষা অন্য অঞ্চলের লোকের কাছে দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণের কথ্য ভাষা দিনাজপুর বা রংপুরের লোকের পক্ষে খুব সহজবোধ্য নয়। এ ধরনের আঞ্চলিক ভাষাকে বলার ও লেখার ভাষা হিসেবে সর্বজনীন স্বীকৃতি দেওয়া সুবিধাজনক নয়। কারণ, তাতে বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষাভাষীদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদানে অন্তরায় দেখা দিতে পারে। সে কারণে, দেশের শিক্ষিত ও পণ্ডিতসমাজ একটি আদর্শ ভাষা ব্যবহার করেন। বাংলা ভাষাভাষী শিক্ষিত জনগণ এ আদর্শ ভাষাতেই পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা ও ভাবের আদান-প্রদান করে থাকেন। বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার কথ্য রীতি সমন্বয়ে শিষ্টজনের ব্যবহৃত এই ভাষাই আদর্শ চলিত ভাষা ।
বাংলা, ইংরেজি, আরবি, হিন্দি প্রভৃতি ভাষার মৌখিক বা কথ্য এবং লৈখিক বা লেখ্য এই দুটি রূপ দেখা যায় ৷ ভাষার মৌখিক রূপের আবার রয়েছে একাধিক রীতি : একটি চলিত কথ্য রীতি অপরটি আঞ্চলিক কথ্য রীতি। বাংলা ভাষার লৈখিক বা লেখ্য রূপেরও রয়েছে দুটি রীতি : একটি চলিত রীতি অপরটি সাধু রীতি ।
লৈখিক
│
┌─────────────────┼─────────────────┐
সাধু চলিত আঞ্চলিক
(সর্বজনস্বীকৃত লেখ্য রূপ) (সর্বজনস্বীকৃত আদর্শ চলিত রূপ (উপভাষা)
সব ভাষারই আঞ্চলিক রূপের বৈচিত্র্য থাকে, বাংলা ভাষারও তা আছে। বিভিন্ন অঞ্চলে কথিত রীতির বিভিন্নতা লক্ষিত হয়; আবার কোথাও কোথাও কারো কারো উচ্চারণে বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার মিশ্রণও লক্ষ্য করা যায়।
পরদিন প্রাতে হেডমাস্টার সাহেবের প্রস্তুত লিস্ট অনুসারে যে তিনজন শিক্ষক সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিবার অনুমতি পাইয়াছিলেন, তাঁহারা আটটার পূর্বেই ডাক-বাংলায় উপস্থিত হইলেন।
একটু পরে আবদুল্লাহ আসিয়া হাজির হইল। তাহাকে দেখিয়া একজন শিক্ষক জিজ্ঞাসা করিলেন—
আপনি যে! আপনার নাম তো হেডমাস্টার লিস্টে দেন নাই।
পুল পেরিয়ে সামনে একটা বাঁশ বাগান পড়ল। তারি মধ্য দিয়ে রাস্তা। মচমচ করে শুকনো বাঁশ পাতার রাশ ও বাঁশের খোসা জুতোর নিচে ভেঙে যেতে লাগল।
পাশে একটা ফাঁকা জায়গায় বুনো গাছপালা লতা ঝোপের ঘন সমাবেশ। সমস্ত ঝোপটার মাথাজুড়ে সাদা সাদা তুলোর মতো রাধালতার ফুল ফুটে রয়েছে।
| পদ | সাধু | চলিত |
|---|---|---|
| বিশেষ্য | মস্তক, জুতা, তুলা | মাথা, জুতো, তুলো |
| বিশেষণ | শুষ্ক, শুকনা, বন্য | শুকনো, বুনো |
| সর্বনাম | তাঁহারা/উহারা, তাহাকে/উহাকে, তাহার/তাঁহার | তাঁরা/ওঁরা, তাকে/ওকে, তার/তাঁর |
| ক্রিয়া | করিবার, পাইয়াছিলেন, হইলেন, আসিয়া, হইল, দেখিয়া, করিলেন, দেন নাই, পার হইয়া, পড়িল/পড়িলো, করিয়া, ভাঙিয়া যাইতে লাগিল, ফুটিয়া রহিয়াছে | করার, পেয়েছিলেন, হলেন, এসে, হল/হলো, দেখে, করলেন, দেননি, পেরিয়ে, পড়ল/পড়লো, করে, ভেঙে যেতে লাগল, ফুটে রয়েছে |
| অব্যয় | পূর্বেই, সহিত | আগেই, সঙ্গে/সাথে |
বাংলা ভাষা গোড়াপত্তনের যুগে স্বল্প সংখ্যক শব্দ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও নানা ভাষার সংস্পর্শে এসে এর শব্দ-সম্ভার বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে তুর্কি আগমন ও মুসলিম শাসন পত্তনের সুযোগে ক্রমে প্রচুর আরবি ও ফারসি শব্দ বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে।
এরপর এলো ইংরেজ। ইংরেজ শাসনামলেও তাদের নিজস্ব সাহিত্য এবং সংস্কৃতির বহু শব্দ বাংলা ভাষায় প্রবেশ লাভ করে। বাংলা ভাষা ঐ সব ভাষার শব্দগুলোকে আপন করে নিয়েছে।
এভাবে বাংলা ভাষায় যে শব্দসম্ভারের সমাবেশ হয়েছে, সেগুলোকে পণ্ডিতগণ কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন –
১. তৎসম শব্দ
২. তদ্ভব শব্দ
৩. অর্ধ-তৎসম শব্দ
৪. দেশি শব্দ
৫. বিদেশি শব্দ
যেসব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে এবং যাদের রূপ অপরিবর্তিত রয়েছে, সেসব শব্দকে বলা হয় তৎসম শব্দ।
"তৎসম" একটি পারিভাষিক শব্দ। এর অর্থ:
তত্ (তার)+সম (সমান)= তার সমান, অর্থাৎ সংস্কৃতের সমান।
উদাহরণ:
চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ভবন, ধর্ম, পাত্র, মনুষ্য ইত্যাদি।
বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার বিভিন্ন উৎস থেকে আগত শব্দ নিয়ে গঠিত। এসব শব্দকে ৫টি ভাগে ভাগ করা যায়:
যেসব শব্দ সংস্কৃত ভাষা থেকে সরাসরি বাংলায় এসেছে এবং যাদের রূপ অপরিবর্তিত, সেগুলোকে বলা হয় তৎসম শব্দ।
📘 উদাহরণ: চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র, ভবন, ধর্ম, পাত্র, মনুষ্য ইত্যাদি।
যেসব শব্দের মূল সংস্কৃত ভাষায় পাওয়া যায়, কিন্তু ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তন ধারায় প্রাকৃত হয়ে পরিবর্তিত হয়ে আধুনিক বাংলা ভাষায় এসেছে, সেগুলো তদ্ভব শব্দ।
'তৎ' (তার) থেকে 'ভব' (উৎপন্ন) → 'তদ্ভব'
📘 উদাহরণ:
তদ্ভব শব্দকে অনেক সময় খাঁটি বাংলা শব্দও বলা হয়।
কিছু সংস্কৃত শব্দ বাংলায় আংশিক পরিবর্তিত রূপে ব্যবহৃত হয়। এসব শব্দকে বলা হয় অর্ধ-তৎসম শব্দ।
📘 উদাহরণ:
| অর্ধ-তৎসম | মূল সংস্কৃত |
|---|---|
| জ্যোছনা | জ্যোৎস্না |
| ছেরাদ্দ | শ্রাদ্ধ |
| গিন্নী | গৃহিণী |
| বোষ্টম | বৈষ্ণব |
| কুচ্ছিত | কুৎসিত |
বাংলা ভাষার প্রাচীনতম স্তর ‘দেশি শব্দ’— যা আদিম জাতিগোষ্ঠীর ভাষা থেকে আগত।
📘 উদাহরণ:
বাংলা ভাষায় বহু বিদেশি শব্দ রয়েছে। এদের উৎসভেদে ভাগ করা যায়:
ধর্মসংক্রান্ত:
আল্লাহ, ইসলাম, ঈমান, কোরবানি, জান্নাত, হজ, হালাল, হারাম
প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক:
আদালত, ইনসান, উকিল, কানুন, কিতাব, রায়, মোক্তার
ধর্মীয়:
খোদা, নামাজ, ফেরেশতা, রোজা
প্রশাসনিক:
তোশক, দরবার, দফতর, দস্তখত, মেথর, বান্দা
বিবিধ:
আমদানি, জানোয়ার, রফতানি, হাঙ্গামা
প্রকৃত উচ্চারণে:
ইউনিয়ন, কলেজ, পেন্সিল, ব্যাগ, স্কুল
পরিবর্তিত উচ্চারণে:
অফিস → অফিস, বাক্স → বাক্স, বোতল → বোতল
| ভাষা | উদাহরণ |
|---|---|
| পর্তুগিজ | আনারস, চাবি, গির্জা, আলমারি, গুদাম |
| ফরাসি | কার্তুজ, কুপন, রেস্তোরাঁ |
| ওলন্দাজ | ইস্কাপন, টেক্কা, রুইতন |
| ভাষা | শব্দ |
|---|---|
| গুজরাটি | হরতাল |
| পাঞ্জাবি | চাহিদা, শিখ |
| তুর্কি | চাকর, চাকু, দারোগা |
| চীনা | চা, চিনি |
| বার্মিজ | লুঙ্গি, ফুঙ্গি |
| জাপানি | রিক্সা, হারিকিরি |
বাংলা+বিদেশি শব্দ মিলে অনেক সময় যৌগ গঠিত হয়:
📘 উদাহরণ:
বিদেশি শব্দের ভাবানুবাদ রূপে তৈরি বাংলা শব্দকে পারিভাষিক শব্দ বলা হয়।
📘 উদাহরণ:
| বাংলা শব্দ | বিদেশি প্রতিশব্দ |
|---|---|
| অম্লজান | Oxygen |
| উদযান | Hydrogen |
| নথি | File |
| প্রশিক্ষণ | Training |
| ব্যবস্থাপক | Manager |
| বেতার | Radio |
| সচিব | Secretary |
| স্নাতক | Graduate |
| স্নাতকোত্তর | Post-graduate |
| সমাপ্তি | Final |
| সাময়িকী | Periodical |
| সমীকরণ | Equation |
বাংলা ভাষার শব্দ-ভাণ্ডার যতই দেশি বা বিদেশি হোক না কেন, আজ এগুলো বাংলা ভাষার নিজস্ব সম্পদ।
তাদের ছাড়া বাংলা ভাষা অপূর্ণ। যেমন: টেলিফোন, রেডিও, স্যাটেলাইট— এসবের বিকল্প বাংলা নেই বা প্রয়োজনও নেই।
কোন মন্তব্য নেই